নিয়াজ শেখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় শহর রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর আসামীদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে তদন্ত এখনো চলমান এবং হত্যার পূর্ণ প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য সব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায়ই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে। রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তারা জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করায় তাদের নতুন করে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, জবানবন্দিতে আসামিরা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। গত শনিবার রাতে নগরীর কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন ৬৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী। গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন এবং অবসরের পর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ না হওয়ার পর স্বজনেরা বাড়িতে গিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রথমদিকে ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে সন্দেহ করা হলেও তদন্ত এগোনোর পর পুলিশের বক্তব্যে হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। নিহতদের স্বজনেরা অবশ্য শুরু থেকেই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহের কথা জানিয়েছিলেন এবং বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির বিরোধের কথাও পুলিশের কাছে উল্লেখ করেছিলেন। এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ প্রথমে ইয়াবা সংগ্রহ করে অন্য একটি স্থানে সেবন করেন। পরে তারা নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি তাদের দেখতে পেয়ে আপত্তি জানান এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন এবং বিষয়টি প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী, মেয়ে এবং ঘুমন্ত ছেলেকেও হত্যা করা হয়। হত্যার পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে খুনিরা। পুলিশ আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাড়িতে কিছু সময় অবস্থান করেন এবং সেখান থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যান। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিছু আলামত ও লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার উদ্ধারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এসব তথ্যের বড় অংশ এখনো পুলিশের তদন্ত-ভিত্তিক বক্তব্য, আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ, ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত ঘটনার বিচারিক সত্য নির্ধারিত হবে। রংপুরের এই হত্যাকাণ্ড আবারও বাংলাদেশে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের বিস্তার, তরুণদের মধ্যে মাদক ব্যবহারের প্রবণতা এবং মাদককে ঘিরে সহিংস অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঘটনাটিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যদি পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া মাদক-সংক্রান্ত কারণটি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ওপর নৃশংস হামলা নয়, বরং মাদক, তরুণ অপরাধ এবং সামাজিক সহিংসতার বিস্তারেরও একটি সতর্কসংকেত। তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে ইয়াবা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় মাদক-সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু রংপুরের এই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেবল মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোই যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। মাদক সরবরাহের উৎস, স্থানীয় বিক্রয় নেটওয়ার্ক, অর্থের প্রবাহ এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র শনাক্ত না করলে সমস্যার মূল উৎস অক্ষত থেকে যেতে পারে। গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ডে দ্রুত গ্রেপ্তার ও আদালতে জবানবন্দি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এত দ্রুত তদন্ত এগোলেও এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কেবল দুই ব্যক্তির ভূমিকা ছিল, নাকি আরও কোনো ব্যক্তি বা নেটওয়ার্ক এতে জড়িত ছিল। এ কারণে তদন্তকারীদের জন্য ফরেনসিক প্রমাণ, মুঠোফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মাদক সংগ্রহের উৎস, হত্যার আগে ও পরে অভিযুক্তদের গতিবিধি এবং উদ্ধার হওয়া আলামতের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি তদন্তের একটি অংশ হলেও সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। জবানবন্দির সঙ্গে অন্যান্য স্বাধীন প্রমাণের মিল রয়েছে কি না, সেটিই হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি পরিবারের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের তদন্ত নয়। এটি মাদক নিয়ন্ত্রণ, তরুণ অপরাধ, স্থানীয় অপরাধচক্র এবং সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখন দ্রুততার পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন, জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা এবং কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ছাড়াই নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে নিহত পরিবারের প্রতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা।
https://slotbet.online/