সরকার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট গত ১১-০৬-২০২৬ খ্রি. তারিখ ঘোষণা করেছেন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি হলো বাংলাদেশের ৫৬তম জাতীয় বাজেট। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করেন। এটি নতুন সরকার হিসেবে বিএনপির প্রথম বাজেট। এই বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট আবশ্যক করার ফলে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) ব্যাহত হওয়া, অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক লেনদেন বৃদ্ধি (নন ব্যাংকিং লেনদেন বৃদ্ধি), ব্যাংকের আমানত প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি জটিলতার ভয় সৃষ্টির মতো নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা দিতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে করজাল সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট আবশ্যক এই বাধ্যবাধকতা আনা হলেও, এর সম্ভাব্য নেতিবাচক অর্থনৈতিক দিকগুলো/প্রভাবসমূহ নিম্নে দেয়া হলো:
১। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) বাধাগ্রস্ত হওয়া :
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও মূলত একটি নগদ-ভিত্তিক অর্থনীতি। দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা সাধারণ শ্রমজীবীদের একটি বড় অংশ করযোগ্য আয়ের আওতায় পড়েন না, টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তাদের জন্য ব্যাংকিং সেবা গ্রহণকে জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে, যার ফলে তারা ব্যাংকিং খাতের বাইরে থেকে যেতে পারেন।
২। অনানুষ্ঠানিক বা ‘ক্যাশ’ লেনদেন বৃদ্ধি:
ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক হলে অনেকেই হয়ত নতুন হিসাব খুলতে বা পুরোনো হিসাব সচল রাখতে নিরুৎসাহিত হবেন। এর ফলে ব্যবসা- বাণিজ্য ও দৈনন্দিন লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের বদলে নগদ অর্থে (Cash) সম্পন্ন হওয়ার প্রবণতা বাড়বে, যা অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা কমানোর পাশাপাশি অর্থ পাচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৩। আমানত ও তারল্য সংকট:
ছোট উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষ যদি ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে ভয় পান বা নিরুৎসাহিত হন, তবে সামগ্রিক ব্যাংক ব্যবস্থায় আমানত (Deposit) ও তারল্যের (Liquidity) প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। এটি পরবর্তীতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা ও ঋণ প্রদানের ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে পারে।
৪। সাধারণ মানুষের মধ্যে হয়রানি ও আইনি জটিলতার ভয়:
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া এবং অন্যান্য আইনি বিষয়গুলো সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে এখনো বেশ জটিল। টিআইএন থাকলেই প্রতি বছর শূন্য রিটার্ন বা নির্দিষ্ট রিটার্ন দাখিল করার বাধ্যবাধকতা থাকে। জরিমানা ও অডিটের ভয়ে অনেকে ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
৫। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধীরগতি:
নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে টিআইএন সংগ্রহ করার প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ হয়, যা ব্যবসায়ের প্রসারে এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৬. ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্টার্ট-আপ নিরুৎসাহিত হওয়া:
নতুন ও ছোট উদ্যোক্তাদের (যারা এখনো কর কাঠামোর আওতায় আসেননি) জন্য প্রাথমিক অবস্থায় টিআইএন নেওয়া একটি অতিরিক্ত বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এতে নতুন উদ্যোগ গড়ে ওঠা কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
৭. সেবা গ্রহণের হার কমে যাওয়া:
অতীতে ক্রেডিট কার্ডের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করায় এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। একইভাবে সব ধরনের ব্যাংক হিসাবের জন্য এই নিয়ম কার্যকর হলে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারনে ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এবং
৮। প্রশাসনিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ:
করযোগ্য আয় নেই এমন নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে টিআইএন নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং প্রতি বছর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করবে।
ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব হতে উত্তরণের উপায়সমূহ নিম্নে দেয়া হলো:
১। সার্বজনীন সচেতনতা ও সহায়তা:
এনবিআর-এর উচিত টিআইএন বা রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সাধারণ মানুষের মনে কর নিয়ে থাকা ভীতি দূর করতে প্রচারণা চালানো।
২। বিকল্প আইনি কাঠামো:
আয়করযোগ্য নয় এমন সাধারণ ব্যক্তি বা শ্রমিকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে টিআইএন থেকে শর্তসাপেক্ষে ছাড় দেওয়া।
৩। রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল:
যাদের আয় করযোগ্য নয়, তাদের জন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ করা, যাতে তারা অযথা আইনি নোটিশ বা হয়রানির শিকার না হন।
৪। স্বয়ংক্রিয় ও সহজতর নিবন্ধন:
টিআইএন প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি আরও সহজ এবং স্বয়ংক্রিয় করতে হবে, যাতে নাগরিকরা ভোগান্তি ছাড়া অনলাইনে অল্প সময়ের মধ্যে টিআইএন পেতে পারেন।
৫। সীমা নির্ধারণ:
সব হিসাবের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক না করে, ব্যাংক হিসাবে বার্ষিক লেনদেন বা গচ্ছিত অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে টিআইএন প্রযোজ্য করার নিয়ম করা যেতে পারে।
৬। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস:
টিআইএন প্রাপ্তি এবং রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি সহজ করার জন্য ব্যাংকিং বুথ বা স্থানীয় পর্যায়ে হেল্পডেস্কের মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থা করা। এবং
৭। সচেতনতা বৃদ্ধি:
যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের প্রতি বছর ‘শূন্য রিটার্ন’ (Zero Return) জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি খুব সহজ এবং তা ভীতিহীন—এই বিষয়ে দেশব্যাপী জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষার জন্য সরকার স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট, নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট (যেমন ১০ টাকার হিসাব), সরকারি ভাতাভোগী এবং পেনশনভোগীদের টিআইএন বাধ্যবাধকতার আওতামুক্ত রেখেছেন।
https://slotbet.online/