বিশেষ প্রতিনিধি, বরিশাল
১৭ জুলাই, ২০২৬
ক্ষমতার দাপট, রাজনৈতিক প্রভাব আর কোটি টাকার খেলা—সবকিছু মিলিয়ে বরিশাল নগরীর কাটপট্টি এলাকায় গড়ে উঠেছিল এক অভেদ্য ভয়ের সাম্রাজ্য। কিন্তু আইনের অমোঘ নিয়মে অবশেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সেই দম্ভ। গ্রাহকের জমানো লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও চেক জালিয়াতির মামলায় বরিশাল ৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা সৈয়দ জামাল হোসেন নোমান এবং সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির লিংকুর ভাই সৈয়দ আব্দুর রহমান তুহিনকে ৮ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গত বুধবার (১৫ জুলাই, ২০২৬) বরিশালের মহানগর দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের বিচারক জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।।তবে রায়ের পর থেকেই এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে চরম উত্তেজনা। কারণ, রায় ঘোষণার সময় আসামি তুহিন আদালতে উপস্থিত না থেকে চতুরতার সাথে আত্মগোপন করেন। আদালত তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার নথিপত্র এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে যে গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য পাওয়া গেছে, তা যেকোনো সাধারণ নাগরিকের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আসামি সৈয়দ আব্দুর রহমান তুহিন (কাটপট্টি সড়কের মৃত সৈয়দ চুন্নু মিয়ার ছেলে) কোনো সাধারণ অপরাধী নন। তার এক ভাই বিএনপি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ জামাল হোসেন নোমান, অন্য ভাই সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির লিংকু। দুই ভাইয়ের রাজনৈতিক দুই মেরুর প্রভাবকে (বিএনপি ও আওয়ামী লীগ) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কাটপট্টি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন তুহিন। দুই ভাইয়ের ক্ষমতার দাপটে তুহিন এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, খোদ বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ইমনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির টাকা আত্মসাৎ করতেও তার হাত কাঁপেনি। এলাকার সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, কোনো ভুক্তভোগীই তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পেতেন না।
”দুই ভাই কাউন্সিলর থাকায় এবং একজন সরাসরি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় পুরো এলাকায় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। তাদের ভয়ে এলাকার মানুষ তটস্থ থাকত।
যেভাবে করা হয় প্রতারণার নীল নকশা
এই ভয়ানক প্রতারণার সূচনা হয়েছিল ২০১৩ সালে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়:
২৪ মার্চ, ২০১৩: কাটপট্টি সড়কের ‘ডেভেলপমেন্ট মাল্টিপারপাস’ সমিতির অনুকূলে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন বাদী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ইমন।
২০২০ সাল: বাদী তার জমানো টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় তুহিনের টালবাহানা। টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো ক্ষমতার গরম দেখিয়ে বাদীকে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫: দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর নিরুপায় হয়ে তুহিন ৭ লাখ ৯০ হাজার টাকার একটি চেক প্রদান করেন।
২৭ মার্চ, ২০২৫: আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে চেকটি জমা দিলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই (চেক ডিজঅনার)।
২১ এপ্রিল, ২০২৫: টাকা পরিশোধের জন্য তুহিনকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ তুহিন সেই নোটিশের কোনো জবাব দেননি।
২ জুন, ২০২৫: বাধ্য হয়ে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ইমন আদালতে চেক জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালত বাদীর সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে গত বুধবার এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এই কঠোর রায় প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পার পাওয়ার দিন শেষ। আইনজীবীদের মতে, একজন আইনজীবীর সাথেই যদি এই প্রভাবশালী চক্র এমন ভয়াবহ প্রতারণা করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের সাথে তারা কী আচরণ করেছে তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। বর্তমানে সাজাপ্রাপ্ত আসামি সৈয়দ আব্দুর রহমান তুহিন পলাতক রয়েছেন। পুলিশের খাতায় তিনি এখন “ফেরার আসামি”। সচেতন মহলের প্রশ্ন—আইনের চোখ এড়াতে এই প্রতারক আর কতদিন পালিয়ে থাকবেন? নাকি এখনো নেপথ্যের কোনো অদৃশ্য শক্তির ইশারায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে গড়িমসি করছে? আদালতের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে দেয়াই এখন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
https://slotbet.online/