ডেস্ক নিউজ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা ও ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় শোকপালন শুরু হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় পর শুরু হওয়া এই আয়োজনকে ইরানি কর্মকর্তারা ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ বলে অভিহিত করছেন। আজ শুক্রবার (৩ জুলাই) থেকে রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি মসজিদ কমপ্লেক্স তথা গ্র্যান্ড মোসল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ রাখা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এক যৌথ হামলায় আলী খামেনি নিহত হন। ওই একই হামলায় তার পরিবারের আরও চার সদস্য নিহত হয়েছিলেন। আজ গ্র্যান্ড মোসল্লায় খামেনির কফিনের পাশে তাঁর সেই চার স্বজনের কফিনও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খামেনির জামাতা মেসবাহ-ওল-হোদা বাঘেরি, বড় মেয়ে সাইয়েদেহ বোশরা হোসেইনি খামেনি, পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং তাঁর ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানির মরদেহ। ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ১৪ মাস বয়সী শিশু জাহরার ছোট্ট কফিনটির সামনে তার একটি ছবিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে শ্রদ্ধা জানাতে আসা হাজারো মানুষের চোখে পানি ধরে রাখা দায় হয়ে পড়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, ছয় দিনের এই বিশাল আয়োজনে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। ইরানের ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনো এত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। জানাজা ও বিদায় অনুষ্ঠানের জন্য প্রতীক হিসেবে ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’ এবং স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে— “আমাদের জেগে উঠতেই হবে”।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও বিশাল প্রস্তুতি
এই স্মরণকালের সেরা জনসমাগম সামাল দিতে এবং শোক জানাতে আসা মানুষদের সুবিধার্থে গ্রহণ করা হয়েছে নজিরবিহীন পদক্ষেপ:
দর্শনার্থীদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব)।
১০ লাখের বেশি মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে তেহরানের কেন্দ্রস্থলজুড়ে তৈরি করা হয়েছে নির্ধারিত পথ।
পুরো কার্যক্রমের নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক প্রধান প্রাদেশিক ইউনিট ‘মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর’।
নিরাপত্তা ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলো শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শহরের কেন্দ্রস্থলের বেশিরভাগ অংশে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া তেহরানের আকাশসীমা শুক্রবার থেকে আংশিকভাবে এবং সোমবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
বিশ্বনেতাদের আগমন ও বাংলাদেশের স্পিকারের উপস্থিতি
আয়াতুল্লাহ খামেনির এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে বিশ্বের কয়েক ডজন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রীরা তেহরানে এসে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও এই জানাজায় যোগ দিতে বর্তমানে তেহরানে অবস্থান করছেন। এই অনুষ্ঠান কভার করতে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি সাংবাদিক ইরানে এসেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের সময়ে কোন কোন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকছেন আর কারা দূরে থাকছেন—তা আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছয় দিনের বিস্তারিত কর্মসূচি
মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানিয়েছেন, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হয়েছে। শনি ও রোববার সাধারণ মানুষ গ্র্যান্ড মোসল্লায় শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। এরপরের কর্মসূচিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
দিন ও তারিখ
স্থান ও কর্মসূচি
শনিবার, রোববার এবং সোমবার
তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন।
মঙ্গলবার
মরদেহ নেওয়া হবে পবিত্র কোম শহরে। জামকারান মসজিদে জানাজায় ইমামতি করবেন শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেম।
বুধবার
ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর সমাধিস্থলে বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা।
বৃহস্পতিবার
নিজ জন্মশহর মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারে দাফন সম্পন্ন।
দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর সারা দেশে আরও ৪০ দিন শোকানুষ্ঠান চলবে এবং প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণসভার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়া ইরান এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে নিজেদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংহতির বার্তা পুনর্ব্যক্ত করতে চাইছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
https://slotbet.online/