• শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
বরিশালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ​ব্ল্যাঙ্ক চেক সিন্ডিকেট: চড়া সুদের ফাঁদে ভিটেমাটি শেষ। বিএমপি কমিশনারের আকস্মিক পরিদর্শন:থানা-ফাঁড়িতে স্বচ্ছতা ও জনবান্ধব সেবার নতুন দিশা। লাইসেন্স নবায়নে চরম অনিয়ম, তদারকির অভাবে ঝুঁকিতে রোগীসেবা; উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের। রক্তক্ষয় নয়, পুনর্নির্মাণ: স্বপ্নভঙ্গের আবর্তে দাঁড়িয়ে কোন বাংলাদেশের অভিমুখে আমরা? বুকে-পিঠে গুলি নিয়ে রাজপথে ছিলাম, আর আজ সুবিধাবাদীদের জায়গা দেওয়া হচ্ছে: বরিশালে ছাত্রদল নেতা এনামের আবেগঘন ফেসবুক স্টাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি বিএমপি কাউনিয়া থানা পুলিশের সাফল্য:২০টি হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধার করে মালিকদের কাছে হস্তান্তর বরিশাল কোতয়ালী থানা পুলিশের অভিযানে বিএম-স্কুল সংলগ্ন এলাকা থেকে মাদক ব্যবসায়ী রানাসহ আটক ২ ইয়াবা আসক্তির কারনে, বাংলাদেশে ধ্বংসের মুখে লাখো জীবন, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র! বরিশাল নগরের হৃদপিণ্ডে ভর করছে মাদকের নেটওয়ার্ক: বস্তি থেকে সদর রোড ও হাসপাতাল রোডে স্থানান্তরিত হচ্ছে ‘মাদক হটস্পট’!

বরিশালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ​ব্ল্যাঙ্ক চেক সিন্ডিকেট: চড়া সুদের ফাঁদে ভিটেমাটি শেষ।

প্রতিনিধি / ২২ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

অবৈধ সুদ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক?

নিয়াজ শেখ, বরিশাল
উচ্চ সুদের লোভনীয় ফাঁদ আর ঋণের জামানত হিসেবে নেওয়া ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ (ফাঁকা চেক) ও স্ট্যাম্পকে হাতিয়ার বানিয়ে বরিশালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একশ্রেণীর অবৈধ সুদ ও দাদন কারবারি। সরল বিশ্বাসে নেওয়া সামান্য টাকা শোধ করতে গিয়ে চড়া সুদের চক্রবৃদ্ধি হারে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। শুধু ভিটেমাটি আর সম্বল হারানোই নয়, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে ইতিপূর্বে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অমানবিক ও বেআইনি ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং সরকারের উচ্চ মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপের জোরালো দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে পলাশপুর, রসুলপুর, কাউনিয়া এলাকাসহ জনবহুল স্থানগুলোতে এই চক্রের আনাগোনা লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতারণা ও জিম্মি করার কৌশল হিসেবে দাদন ব্যবসায়ীরা ঋণ দেওয়ার সময় গ্রহীতার কাছ থেকে স্বাক্ষর করা ব্ল্যাঙ্ক চেক, ফাঁকা স্ট্যাম্প ও জমির মূল দলিল জমা রাখা। পরবর্তীতে সেই ফাঁকা স্ট্যাম্প বা চেকে মনগড়া টাকার অঙ্ক বসিয়ে মামলা দেওয়া হয়।
ঋণগ্রহীতা আসল টাকা ও সুদের একটি বড় অংশ পরিশোধ করলেও পরবর্তীতে ব্ল্যাঙ্ক চেকে ইচ্ছেমতো মোটা অঙ্কের টাকা বসিয়ে ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১’-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী ব্যাংক চেক ডিজঅনারের মামলা দায়ের করা হয়। ভুক্তভোগী ঋণগ্রহীতারা সামাজিক মর্যাদা হানি, পুলিশি ঝামেলা ও আদালতের বারান্দায় ঘোরার ভয়ে অনেক ক্ষেত্রে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে সুদের টাকা সময়মতো না দিতে পারলে ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক সই নিয়ে জমিজমা, বসতভিটা ও দোকানপাট লিখে নেওয়ার অগণিত নজির রয়েছে এ শহরে। গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাউনিয়া জানুকিসিংহ রোড, মনসাবাড়ি, কাউনিয়া প্রধান সড়ক এবং বিসিক এলাকাতেই প্রায় ২০ থেকে ৩০ জনের ওপর ছোট-বড় অবৈধ সুদের কারবারি সক্রিয় রয়েছে, যারা রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাউনিয়া এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, এসব অবৈধ সুদ কারবারিদের জীবনযাত্রার মান এবং আয়ের উৎসের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। প্রকাশ্যে দেখা যায় একজন সামান্য চা বিক্রেতা, যার দোকানে বেচাকেনাও চোখে পড়ার মতো নয়, কিন্তু বাজারে সবচেয়ে দামি মাছ কিনে নিয়ে তিনি ঘরে ফেরেন। প্রশ্ন ওঠে, এত টাকা কোথা থেকে আসে? মূলত অশিক্ষিত, ভাড়াটিয়া এবং দিনমজুর শ্রেণির মানুষই এদের প্রধান টার্গেট, যাদের সহজে আইনের মারপ্যাচে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া যায়। কাউনিয়া ও পলাশপুর এলাকার অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দোকানে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার মালামালও নেই, যা থেকে দিন শেষে ১ হাজার টাকা লাভ করা কঠিন। অথচ সেই দোকানদারের মুখোশের আড়ালে থাকা সুদ কারবারি নিজ সন্তানকে প্রতিদিন ২ হাজার টাকা হাতখরচ দিচ্ছেন, কিনে দিচ্ছেন নামি-দামি ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন, মোটরবাইক ও ঘড়ি। কাউনিয়া পিছনস্কুল এলাকার স্থানীয় বাসিন্দার মতে, “সব অভিভাবকই সন্তানকে সেরাটাই দিতে চায়, কিন্তু খেটে খাওয়া অসহায় মানুষের রক্তচোষা টাকায় যখন এই বিলাসী জীবন চলে, তখন প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এবার আসা যাক আইন কি বলে এই অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে?
এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট অবস্থান হলো কোনো অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ (যেমন: মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি – MRA) থেকে বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সুদের ব্যবসা পরিচালনা করা আইনত সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। অনেকের ধারণা সুদের ব্যবসা শুধু অর্থ সংক্রান্ত বিষয় হওয়ায় পুলিশের কিছু করার নেই। তবে ব্ল্যাঙ্ক চেক জিম্মি করা, ভয়ভীতি দেখানো এবং সুদের নামে প্রতারণা করার বিরুদ্ধে পুলিশ একাধিক ফৌজদারি ধারায় সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে যেমন পেনাল কোড (১৮৬০)-এর ৪২০ ধারা: চড়া সুদের ফাঁদে ফেলে বা ঋণের অতিরিক্ত টাকা দাবি করে প্রতারণা করলে এই ধারায় মামলা গ্রহণ করা যায় (সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা)। ধারা ৩৮৪ (Extortion/জোরপূর্বক আদায়): ফাঁকা চেক বা স্ট্যাম্প অপব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ বা সম্পত্তি আদায়ের চেষ্টা করলে এই ধারায় অভিযোগ দায়ের সম্ভব (সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড)। ধারা ৫০৬ (অপরাধমূলক ভয়ভীতি প্রদর্শন): চেক ডিজঅনারের ভয় দেখিয়ে, মানহানি বা শারীরিক ক্ষতির হুমকি দিলে এই ধারায় মামলা হয়। ধারা ৪০৬: বেআইনিভাবে রাখা ব্ল্যাঙ্ক চেক ফেরত না দিয়ে অপব্যবহার করা ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ (Criminal Breach of Trust) হিসেবে গণ্য হয়। মহাজনি আইন (Money Lenders Act, 1933): বাংলাদেশ ব্যাংক বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের বৈধ লাইসেন্স ছাড়া সুদের ব্যবসা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ。 স্থানীয় প্রশাসন এই আইনের অধীনে অবৈধ সুদের আস্তানা সিলগালা ও মহাজনদের গ্রেফতার করতে পারে।
বর্তমানে ‘দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (NI Act, 1881)’ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক একাধিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে—সুদের ব্যবসায়ী বা অননুমোদিত ব্যক্তি যদি জামানত হিসেবে নেওয়া ব্ল্যাঙ্ক চেক নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করে মামলা করেন, তবে তা আইনের অপব্যবহার। মামলার শুনানিতে প্রকৃত ঋণের প্রমাণ না থাকলে এবং চেকে অন্যায়ভাবে টাকা বসানোর প্রমাণ পেলে আদালত তা বাতিল করতে পারেন। অবৈধ দাদন ব্যবসায়ী ও সুদখোরদের দৌরাত্ম্য বন্ধে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ জানানো অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে。 পুলিশ প্রশাসন চাইলে ব্ল্যাঙ্ক চেক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইন বা পেনাল কোডের নির্দিষ্ট ধারায় এজাহারভুক্ত মামলা দায়ের করতে পারে। সুদের চক্র থেকে সমাজকে মুক্ত করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...

https://slotbet.online/