নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে বরিশাল নগরীতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত অভিযানে শীর্ষ মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হলেও নগরীর রসুলপুরসহ বিভিন্ন গুপ্ত আস্তানায় গোপনে সক্রিয় রয়েছে মাদক সিন্ডিকেট। অভিযানে একদিকে যেমন বড় বড় চালান আটক হচ্ছে, অন্যদিকে কৌশলে সরবরাহ বাড়িয়ে বিশাল লাভের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি অসাধু চক্র। এই চক্রের অন্যতম মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে রসুলপুর এলাকার আলোচিত সোহাগী বেগমকে (২৮) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যার শিকার হচ্ছে গোটা নগরী। পূর্বের প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের প্রাপ্ত তথ্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, একের পর এক অভিযান চালানো সত্ত্বেও সোহাগী বেগমকে কেন্দ্র গড়ে ওঠা মাদক ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, গত ৯ই মে ২০২৬ ইং তারিখে নগরীর রসুলপুর এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক বড় অভিযানে সোহাগীর আস্তানা থেকে ১ হাজার ৫৮ পিস ইয়াবা, দেড় কেজি গাঁজা এবং মাদক বিক্রির নগদ প্রায় ৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার প্রমাণ করে যে সেখানে দিনে লাখ লাখ টাকার মাদকের বিকিকিনি চলছিল। ডিএনসির অভিযানের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায়, ১৬ই মে ২০২৬ কাউনিয়া থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২৭১ পিস ইয়াবাসহ চারজনকে আটক করে। পুলিশের তথ্যমতে, ওই চক্রেরও অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন সোহাগী।বরিশাল নগরীর বিভিন্ন থানায় সোহাগীর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। কেবল সোহাগীই নন, তার স্বামী রেজাউল শিকদারসহ পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধেও মাদক কেনাবেচার অভিযোগে অতীতে মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। গোঁপন সূত্রে জানা যায়, সোহাগীর মা ফিরোজা বেগম ও তার বেয়াই ইব্রাহিম টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান পাচারের সাথে জড়িত (পাইকারী)। ইব্রাহিম এর বাড়ি চিটাগাং। এছাড়াও সোহাগীর আত্মীয় কমলা এবং জসিম, খুকু ও নাসির দম্পতি, দিপু ও পূন্নি দম্পতি, সিরাজ ও নদি দম্পতি(টেলি মনির এর জামাই)। আলামিনও জুলি দম্পতি, পাখিও রাকিব দম্পতি রসুলপুরে প্রকাশ্যে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রী করছে। এছাড়াও সোহাগীর নেতৃত্বে রুপা স্বামী আকাশ, আকাশের পিতার নাম শহিদ। হিরা স্বামী টেইলার সাবু, আখি ও রাসেল দম্পতি রসুলপুরে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের ভেতরেও কীভাবে ব্যবসা চলছে, তা নিয়ে সম্প্রতি এক আড়াল অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিচয় গোপন রেখে নগরীর রসুলপুর একালার এক খুচরা মাদকব্যবসায়ীর সাথে আলাপকালে সে জানায়, বরিশালের অধিকাংশ মাদক স্পটগুলো বন্ধ থাকায়, সোহাগী আগে যেখানে দিনে একশত ইয়াবা বিক্রি করতো, এখন সেখানে প্রায় এক হাজারটি পর্যন্ত বিক্রি করছে। সরজমিনে গিয়ে দেখা রসুলপুরে মাদকসেবীদের দীর্ঘ লাইন এবং প্রতি পিছ ইয়াবা ৩০০শত টাকা মূল্যে বিক্রী করছে সোহাগী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় এবং অনেকে ব্যবসা বন্ধ রাখায় বাজারে অন্য বিক্রেতাদের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বাজারে একক আধিপত্য বা চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সোহাগীর বিক্রির পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরবাসীর অভিযোগ, অভিযানের পর সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় মাদক বিক্রি কমলেও দ্রুত তা আগের রূপ নেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্য এবং এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এই কারবারিরা আড়ালে থেকে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রসুলপুর, পলাশপুর, কাউনিয়া, বিসিক, তালতলী, বিমানবন্দর, কাশিপুর ও চরকাউয়া সীমান্ত এলাকায় সোহাগী সিন্ডিকেটের পাশাপাশি একাধিক সমন্বিত খুচরা বিক্রেতা সক্রিয় রয়েছে। নগরবাসী প্রশ্ন তুলছেন—একদিকে যখন বহু মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়ে জেলে রয়েছেন, অন্যদিকে কীভাবে এই চিহ্নিত অপরাধীরা জামিনে এসে বা গোপনে বিশাল অঙ্কের মাদক বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারছে? মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু চুনোপুঁটি বা খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়; বরং এই চক্রের নেপথ্য চালিকাশক্তিগুলোকে সমূলে উপাড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি। রসুলপুরের সোহাগীকে ঘিরে প্রকাশ হওয়া অপরাধচিত্র এবং আড়ালে মাদক বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধির দাবি বরিশাল নগরীতে মাদকের জটিল ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের উপস্থিতির প্রমাণ দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রশংসনীয় হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য মূল অর্থদাতা, আন্তর্জাতিক বা আন্তঃজেলা পাইকারি রুট এবং কথিত পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।
https://slotbet.online/