অনলাইন ডেস্ক: ২৯ জুলাই ২০২৬ : ইয়াবা নিয়ে আন্তর্জাতিক গনমাধ্যম দ্য আইরিশ টাইমস সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তিকে “মহামারি” আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে মেটালফ্রিক’ নামের (৪০) এক ব্যক্তির জীবন ধ্বংসের গল্পকে তুলে ধরা হয় যেখানে মেটালফ্রিক সুস্থ জিবনে প্রতিদিন নিজের পোষা পাখির সঙ্গে সময় কাটাতেন—তাকে আদর করতেন, খাঁচা পরিষ্কার করতেন, উড়ে বেড়ানোর জন্য খোলা জায়গায় ছেড়ে দিতেন। কিন্তু এখন তিনি সেই পাখিটিরও খোঁজ রাখতে পারেন না। রাজধানীর একটি অগোছালো শোবার ঘরে শুয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখন এসব আর করতে পারি না। কে-ই বা পাত্তা দেয়? মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি ‘ইয়াবা’—যার থাই ভাষায় অর্থ ‘পাগলা ওষুধ’—তাঁর মস্তিষ্কে এমনই প্রভাব ফেলেছে যে তিনি নিজের জীবনও গুছিয়ে নিতে পারছেন না। এই একটি প্রতিকৃতি বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবনের করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে, যা সম্প্রতি দ্য আইরিশ টাইমসের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত জুনে জানান, প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ—যা সংখ্যায় প্রায় ৮৫ লাখের বেশি—মাদকাসক্ত। ‘নতুন সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক মাদকের আবির্ভাব এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে,’ বলেন তিনি। চলতি মাসে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংসদে একটি বিল পাস করা হয়েছে। মেটালফ্রিক বলেন একটি টিনফয়েলের ওপর কমলা রঙের বড়িটি রেখে নিচ থেকে তাপ দিয়ে তিনি ধোঁয়া টানেন। প্রতিটি বড়ির প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। তিনি টানা তিন দিন জেগে থাকেন, এরপর ক্লান্ত হয়ে একবারে ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ঘুমান। যুবক বয়সে গাঁজার মতো ‘ডাউনার্স’-এর সঙ্গে পরিচিত মেটালফ্রিক প্রথমবার ইয়াবা গ্রহণ করেন বন্ধুদের সঙ্গে ‘চিল’ করার জন্য। কিন্তু তিনি বলেন, ‘এটা আমার মাথার তার ছিঁড়ে দেয়… এ জিনিস মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়। ইয়াবা মানুষকে ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয়, যা অনেককে অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী করে তোলে, তার কথাবার্তা এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে লাফিয়ে বেড়ায়—কখনো কিম জং-উন, কখনো গাজা বা ভ্লাদিমির পুতিন প্রসঙ্গ চলে আসে। তিনি আরও জানান, ইয়াবা আগে দামি ছিল। এখন সস্তা ও দামি—দুই ধরনই পাওয়া যায়। সস্তা সংস্করণটি মুখ ও দাঁতের ‘বারোটা বাজিয়ে দেয়’ এবং চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় ব্যবহারকারী উন্মাদ। নিয়মিত সেবনে স্ট্রোক, দাঁত পড়ে যাওয়া এবং খিঁচুনির মতো শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইনের চেয়ে ইয়াবা অন্য সব মাদককে হটিয়ে দিয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অল্পবয়সী ছেলেরা রাস্তায় বড়ির প্যাকেট উঁচিয়ে ধরে, আর রিকশাচালকেরা হাত বাড়িয়ে তা কিনে নেন—এটি এখন সাধারণ দৃশ্য। বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট দুতার্তের ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ মতো সাঁড়াশি অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ, যাতে কয়েক মাসেই ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন নিহত হয়েছিলেন এবং এই অভিযান ‘দেশের দরিদ্রতম এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়’। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার সে সময় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঠোর অভিযানের পরও মাদকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে চাই, তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।’ তিনি ঢাকার নিরাময় রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে কাজ করেন, যার দেয়ালে লেখা: ‘যেখানে আরোগ্য শুরু, সেখানেই জীবন অপেক্ষমাণ। তিনি জানান, সারা দেশে মাত্র ৩৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন এবং যোগ্য মনোবিজ্ঞানীরও তীব্র ঘাটতি রয়েছে। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ শরণাপন্ন হন না। ডা. আরিফুজ্জামানের মতে, অনেক ব্যবহারকারী বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা সাইকোসিস থেকে মুক্তি পেতেই মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং অনেকে নেশার খরচ জোগাতে মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যান। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ কার্যালয়ের (UNODC) তথ্যমতে, ১৯৯০-এর দশকের শেষে ‘যুব সংস্কৃতির’ অংশ হওয়ার আগে এশিয়ায় ট্রাকচালকেরা ইয়াবা ব্যবহার করতেন। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এখন সিন্থেটিক মাদকের অন্যতম সক্রিয় উৎপাদন কেন্দ্র, যেখান থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশ করে। ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা—২০২৪ সালের বিক্ষোভে শেখ হাসিনার পতন (প্রায় ১৪০০ নিহত) এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়—তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। মেটালফ্রিক বলেন, ‘সবারই একই করুণ গল্প রয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে যাওয়া এবং বাবার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বন্ধুদের কটাক্ষের শিকার এই মানুষটি এখন শুধু ইনস্টাগ্রামে গাজার ভিডিও দেখেন। তিনি বিশ্বজুড়ে বাদামি বর্ণের মানুষ ও মুসলমানদের ‘মূল্যহীন’ হিসেবে দেখার প্রতিও হতাশা প্রকাশ করেন এবং আরো বলেন আমি সুবিধাপ্রাপ্ত, কারণ আমার একটি ঘর আছে, আগামীকাল কে আমাকে খাওয়াবে তা নিয়ে ভাবতে হয় না,’ বলেন মেটালফ্রিক। তবে তিনি মাদকের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে শঙ্কিত। ইয়াবা সেবনকারীরা যেহেতু ঘুমায় না, তাই ‘কখনোই দুই বছর টিকতে পারবেন না’—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এটি একটি ধীর গতির বিষক্রিয়া, একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।’
https://slotbet.online/