এসএন পলাশ, বরিশাল
জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর একটি হলো ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা। সবুজায়ন সম্প্রসারণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সারা দেশের ন্যায় বরিশালেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কয়েক মাস ধরে চলছে বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার আয়োজন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চারা বিতরণের পাশাপাশি সড়ক, খালপাড়সহ বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাপক পরিসরের এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে উঠেছে নানা প্রশ্ন। চারা সংগ্রহ ও বিতরণ থেকে শুরু করে রোপণ, পরিচর্যা, তদারকি এবং বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় কম চারা রোপণ করা হয়েছে, আবার কোথাও রোপণের পর যথাযথ পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে চারা। সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। ফলে বড় আয়োজন ও বিপুলসংখ্যক চারা রোপণের ঘোষণার বিপরীতে বাস্তবে কতটা সবুজায়ন হচ্ছে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। বরিশাল সামাজিক বন বিভাগ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরীসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে লক্ষাধিক চারা রোপণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব চারার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে বিপুল অর্থ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সরেজমিন গিয়ে ঘোষিত সংখ্যার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ইতোমধ্যে ২২ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাকেরগঞ্জের গারুলিয়া ইউনিয়নে ৮ হাজার, ভরপাশা ইউনিয়নে ৯ হাজার এবং পাদ্রিশিবপুর ইউনিয়নে ৩ হাজার চারা রোপণের কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি চারার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৩০০ টাকা করে ব্যয় ধরা হয়েছে। সে হিসাবে ২২ হাজার চারার রক্ষণাবেক্ষণেই বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬ লাখ টাকা। সরেজমিন গিয়ে ঘোষিত সংখ্যার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক দেখা গেছে। বাকেরগঞ্জের গারুলিয়া ইউনিয়নের চরবালি গ্রামের খেয়াঘাট এলাকায় ৮ হাজার চারা রোপণের কথা বলা হলেও সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির আনুমানিক দেড় হাজার চারা পাওয়া গেছে। অনেক স্থানে চারার কোনো অস্তিত্বই নেই। কিছু চারা থাকলেও সেগুলোর পরিচর্যার চিত্রও সন্তোষজনক নয়। স্থানীয় বাসিন্দা রফিক ফকির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোথায় লাগিয়েছে ৮ হাজার চারা? আমি তো দেখিনি। এতগুলো চারা দিয়ে আমাদের গ্রামই ঢেকে ফেলা যাবে। একই চিত্র দেখা গেছে বাকেরগঞ্জের ভরপাশা ইউনিয়নের কৃষ্ণকাঠি গ্রামে। নাপিতের খালের গোড়া থেকে শ্রীমন্ত নদী পর্যন্ত ৯ হাজার চারা রোপণের কথা জানিয়েছে সামাজিক বন বিভাগ। কিন্তু সরেজমিনে পুরো এলাকায় সর্বোচ্চ দুই হাজারের মতো চারা দেখা গেছে। অনেক জায়গায় রোপণ করা চারার কোনো চিহ্ন নেই। যেসব চারা রয়েছে, সেগুলোরও বড় অংশ অযত্নে পড়ে আছে।
ভরপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সবুজ তালুকদার বলেন, “বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে, তবে কী পরিমাণ চারা রোপণ করা হয়েছে, তা জানি না। হয়তো এক হাজার থেকে ১২শ চারা রোপণ করা হয়েছে।” শুধু বাকেরগঞ্জ নয়, গৌরনদী উপজেলার সরিকল-বাটাজোর খালের দুই পাশেও বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। তবে সেখানে ঠিক কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে, তার হিসাব জানাতে পারেনি বন বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ওই খালের দুই পাশে বৃক্ষরোপণকে জাতীয় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রেও প্রকৃত রোপিত চারার সংখ্যা ও ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বরিশাল নগরীতেও রয়েছে একই ধরনের অভিযোগ। নগরীর ত্রিশ গোডাউন বধ্যভূমি-সংলগ্ন সাগরদী খালের পাড়ে ৩৫০টি নারিকেলের চারা রোপণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এরই মধ্যে বেশকিছু চারা নষ্ট হয়ে গেছে। নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার কিংবা চারার সুরক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। বন বিভাগের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি এখানে মাত্র তিন মাস হলো যোগ দিয়েছি। আগের সময়ে কোথায় কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হয়েছে, এ বিষয়ে আমার কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।”
https://slotbet.online/