ডেস্ক নিউজ : রাজনীতির মাঠে সহিংসতা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে একের পর এক রাজনৈতিক নেতা পরিকল্পিতভাবে গুলির নিশানায় পরিণত হচ্ছেন, তা আর সাধারণ রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে না। এটি স্পষ্টভাবে টার্গেট কিলিং। আর এই টার্গেট কিলিং কেবল ব্যক্তিকে নয়, সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আসন্ন নির্বাচনী পরিবেশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি মিল চোখে পড়ে। অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে প্রকাশ্যে, কাছ থেকে গুলি করে, মুখোশধারী বা পেশাদার শুটারদের মাধ্যমে। হামলার ধরন, সময় নির্বাচন, পালিয়ে যাওয়ার কৌশল—সবই বলে দেয় এটি আবেগের বশে করা খুন নয়, বরং ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা।
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই অন্তত ১০৮ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বড় অংশই বিএনপি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের মাঠপর্যায়ের নেতা। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি জীবন্ত দলিল।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এসব হত্যাকাণ্ডের পর দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। কোথাও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোরালো অভিযান নেই, নেই পেশাদার খুনিদের ধরতে বিশেষ টাস্কফোর্স। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিক্রিয়াশীল হলেও আগাম প্রতিরোধমূলক ভূমিকায় প্রায় অনুপস্থিত।
একজন জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্বীকার করছেন, গত ১৬ মাসে রাজধানীতে যেসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেগুলোর পর যে মাত্রার তৎপরতা দরকার ছিল, তা হয়নি। ডিএমপি ও গোয়েন্দা পুলিশের পুরোনো নিয়মিত অভিযান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও দাগি অপরাধী ধরার যে দৃশ্য একসময় দেখা যেত, তা এখন আর চোখে পড়ে না। এই শূন্যতাই অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ তত্ত্ব সামনে আনার কারণে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হচ্ছে। একটি রাজনৈতিক হত্যার পর যখন দায়িত্বশীল মহল সেটিকে রাজনৈতিকভাবে হালকা করে দেখায়, তখন খুনিরা ধরে নেয়—এই অপরাধও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিতর্কে চাপা পড়ে যাবে।
৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় পরিবর্তনও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। থানা হামলা, অস্ত্র লুট, পুলিশ সদস্য নিহত হওয়া এবং ব্যাপক বদলির ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের মানসিক ও পেশাগত স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তার নিজ নিজ এলাকার অপরাধী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। ফলে অপরাধ দমন কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পলাতক সন্ত্রাসী, ভাড়াটে খুনি এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা অস্ত্রধারী গ্রুপ। নির্বাচন সামনে রেখে জনপ্রিয় নেতা, সম্ভাব্য প্রার্থী কিংবা প্রভাবশালী সংগঠকদের পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কোথাও আধিপত্য বিস্তার, আবার কোথাও সরাসরি অর্থের বিনিময়ে খুন।
উদ্বেগ আরও বাড়ে তখনই, যখন দেখা যায় আলোচিত অনেক হত্যাকাণ্ডে শুটার বা মধ্যম স্তরের পরিকল্পনাকারী শনাক্ত হলেও নেপথ্যের অর্থদাতা ও নির্দেশদাতারা রয়ে যায় অন্ধকারেই। দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হয়, কিন্তু তদন্তের গভীরে গিয়ে প্রশ্ন তোলার আগ্রহ দেখা যায় না। এতে করে বিচার প্রক্রিয়া থাকলেও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
টার্গেট কিলিংয়ের এই ধারাবাহিকতা শুধু রাজনৈতিক নেতা হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরাসরি নির্বাচনী পরিবেশে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। নেতা আতঙ্কিত হলে কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়, ভোটার চুপ করে যায়, আর সহিংসতাই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ভাষা।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ এখনো খোলা আছে, তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আলাদা ও ধারাবাহিক অভিযান চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, পেশাদার খুনিদের একটি কেন্দ্রীয় ও হালনাগাদ ডাটাবেজ তৈরি করে তাদের ধরতে বিশেষ ইউনিট গঠন জরুরি। তৃতীয়ত, প্রতিটি টার্গেট কিলিংয়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্দেশের সূত্র ধরে তদন্ত করতে হবে, তা যত প্রভাবশালী মহলেই গিয়ে ঠেকুক না কেন।
আজ প্রশ্ন শুধু এটুকুই—রাষ্ট্র কি সত্যিই টার্গেট কিলিংয়ের এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক ভাঙতে প্রস্তুত, নাকি পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের পরও আমরা আবার বলব, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
https://slotbet.online/