নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল |
বরিশাল জেলায় পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন করা হয়নি। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৩৮১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৯৬টি প্রতিষ্ঠান ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৬০টি। চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেনি।
জানা গেছে, বরিশালের প্রভাবশালী চিকিৎসক ও নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অমিতাভ সরকারের প্রতিষ্ঠিত কেএমসি হাসপাতাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের পর থেকে লাইসেন্স নবায়ন করেনি। এ হাসপাতালেই ২০২৬ সালের ১০ জুন মনির খান (৩৮) নামে এক রোগীর ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। নিহত মনির বাবুগঞ্জ উপজেলার উত্তর বাহেরচর গ্রামের বাসিন্দা। অভিযোগের প্রতিবাদ জানাতে গেলে রোগীর স্বজনদের হাসপাতালে আটকে মারধরের অভিযোগও উঠে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এর আগে ২০২৬ সালের ১৯ মে বরিশাল নগরের বেলভিউ হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিক্যাল সার্ভিসে ভুল চিকিৎসায় নুজাইফা আহমেদ নামে এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। শিশুটির বাবা-মা দুজনই চিকিৎসক। শিশুটির বাবা, শেবাচিম হাসপাতালের মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. ইশতিয়াক আহমেদ রিফাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগ তুলে ধরেন। একই প্রতিষ্ঠানে ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট শাহনাজ পারভীন (৪০) নামে আরেক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায়ও চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ করেছিলেন স্বজনরা। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পর আর লাইসেন্স নবায়ন করেনি বলে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া অ্যাডভোকেট হেমায়েত উদ্দিন আহমেদ ডায়াবেটিস হাসপাতাল ২০১৮-১৯, মিড টাউন হাসপাতাল ২০২০-২১, আরিফ মেমোরিয়াল হাসপাতাল ২০২২-২৩ এবং বরিশাল সেন্ট্রাল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ২০২২-২৩ অর্থবছরের পর থেকে লাইসেন্স নবায়ন করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তারা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছে এবং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বেলভিউ হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রিয়াজ হাসান বলেন, তাদের লাইসেন্স বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে নবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য হালনাগাদ নাও হতে পারে। অতীতে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। তবে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুন্সী মুবিনুল হক জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে, সেই তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জমা পড়া আবেদনগুলোর অনুমোদন এখনো সম্পন্ন হয়নি।
এদিকে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশালের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো কার্যত নিজেদের ইচ্ছামতো সেবা দিচ্ছে। কার্যকর তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে সাধারণ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্স নবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে রোগীদের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
https://slotbet.online/