নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
বরিশাল নগরীর রসুলপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যেই ফের আলোচনায় এসেছে আলোচিত নারী মাদক ব্যবসায়ী সোহাগী বেগম। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পৃথক অভিযানের মধ্যেও তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আগেই কৌশলে স্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনে যাওয়ার ঘটনায় রসুলপুরে মাদকবিরোধী অভিযান ও তথ্য ফাঁসের সম্ভাব্যতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রসুলপুর এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বরিশালের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানিক দল সোহাগীর বাসায় পৌঁছানোর আগেই তিনি সেখান থেকে সরে যান। পরে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সোহাগী প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে একই দিন সন্ধ্যায় তাকে আটকের উদ্দেশ্যে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকেও অভিযান চালানো হয় বলে জানা গেছে। পুলিশের অভিযানেও সোহাগীকে পাওয়া যায়নি। ফলে একই দিনে দুই দফা অভিযান পরিচালিত হলেও অভিযুক্ত নারীকে আটক করতে না পারায় রসুলপুরে তার অবস্থান, চলাফেরা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের খবর কীভাবে তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক অভিযানের পর আরেক অভিযান, তবু ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন? সোহাগীকে ঘিরে বিতর্কের সূত্র অবশ্য নতুন নয়। গত ৯ মে রসুলপুরে ডিএনসির অভিযানে তার কাছ থেকে ১ হাজার ৫৮ পিস ইয়াবা, ১ কেজি ৫৮০ গ্রাম গাঁজা এবং মাদক বিক্রির নগদ ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৮৩০ টাকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংস্থাটি। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। এর মাত্র এক সপ্তাহ পর ১৬ মে কাউনিয়া থানা পুলিশের অভিযানে ২৭১ পিস ইয়াবাসহ চারজনকে আটক করার তথ্যও প্রকাশিত হয়। পুলিশি তথ্যে আটক ব্যক্তিদের একজন সোহাগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এতসব অভিযান ও মামলার পরও যদি একই এলাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, অভিযানের পরবর্তী নজরদারি কতটা কার্যকর হচ্ছে? স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রসুলপুর অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সরু রাস্তা, ঘনবসতি এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তনের সুযোগ থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান সম্পর্কে আগাম সতর্ক হলে অভিযুক্তদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায়ও এমনটাই ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। ডিএনসির দল সোহাগীর বাসায় পৌঁছানোর আগেই তিনি সরে যান। সন্ধ্যায় পুলিশের অভিযানেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে অভিযান শুরুর আগে অভিযুক্তের কাছে খবর পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে কীভাবে পৌঁছেছিল, নাকি তিনি নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি বুঝতে পেরেছিলেন, তা তদন্তের বিষয়। বড় প্রশ্ন এখন ‘সোহাগী’ নয়, নেটওয়ার্ক কোথায়? মাদকবিরোধী অভিযানে একজন বিক্রেতাকে আটক করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার সরবরাহকারী, অর্থের উৎস, যোগাযোগের মাধ্যম এবং মাদকের সরবরাহপথ শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সোহাগীকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর পাশাপাশি তার সঙ্গে কারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখে, কার কাছ থেকে মাদক আসে, কোথায় সরবরাহ যায় এবং মাদক বিক্রির অর্থ কোথায় যায়, এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলে পুরো নেটওয়ার্কের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু রসুলপুর নয়, নগরীর অন্যান্য মাদক স্পটের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার আগেই সোহাগী কীভাবে বারবার সরে যাচ্ছেন? এটি নিছক কাকতালীয় ঘটনা, নাকি তার নিজস্ব সতর্কতাব্যবস্থা রয়েছে, নাকি অভিযানের তথ্য কোনোভাবে আগেই তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের বিষয়। কারণ ৯ মে বিপুল পরিমাণ মাদক ও নগদ অর্থ উদ্ধারের পরও যদি কয়েক মাসের ব্যবধানে একই ব্যক্তিকে ঘিরে আবারও অভিযান পরিচালনা করতে হয় এবং অভিযানের সময় তিনি পরপর দুই দফা স্থান ত্যাগ করে আত্মগোপনে যেতে সক্ষম হন, তাহলে বিষয়টি শুধু একজন মাদক ব্যবসায়ীকে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি নগরীর মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অভিযানের গোপনীয়তা রক্ষার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি সত্যিই রসুলপুরের মাদকচক্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে চায়, তাহলে শুধু সোহাগীকে খোঁজা নয়, তার সম্ভাব্য সহযোগী, সরবরাহকারী, অর্থের উৎস এবং মাদক ব্যবসার যোগাযোগব্যবস্থাকে শনাক্ত করাই হতে পারে পরবর্তী বড় পরীক্ষা। সোহাগী কোথায়, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কিন্তু রসুলপুরে তার নেটওয়ার্ক যদি সত্যিই সক্রিয় থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো, অভিযানের পরও সেই নেটওয়ার্ককে থামানো যাচ্ছে না কেন?
https://slotbet.online/