ডেস্ক নিউজ: ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আসা কয়েকজন তারকা সন্ত্রাসীর মধ্যে সানজিদুল ইসলাম ইমন, তারিক সাঈদ মামুন, খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন ও ইমামুল হাসান হেলাল পিচ্চি হেলালের নাম অন্যতম। একসময়ের ঘনিষ্ঠ জুটি ও আত্মীয় সম্পর্কের বাঁধনে আবদ্ধ থাকলেও অধিকারের টানাপড়েন, চাঁদাবাজির আধিপত্য ও জেল-হাজতের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব দিনদিন প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রায় দুই দশকের অধিক সময় জেল-হাজতে কাটিয়েও তারা বাইরের অপরাজগত নিয়ন্ত্রণ করেছে মোবাইল ফোন আর ভাড়াটে কিলার বাহিনীর মাধ্যমে। সরকার বদলালেও বদলায়নি তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ধারা। মামুন, টিটন ও ইমন জেল-হাজতে ছিলেন যথাক্রমে ২৬, ২২ ও ১৯ বছরেরও বেশি সময়। দীর্ঘ এই সময়ে কারাগারের ভেতর থেকে তারা ঢাকা শহরের বড় একটি অংশের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেছেন। মামুন ২০২৩ সালে প্রায় ২৬ বছর পর জামিনে বের হন। বের হয়েই তিনি আলাদা একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করেন, যা সাবেক বন্ধু ইমনের সঙ্গে তুমুল দ্বন্দ্বের সূচনা করে। অন্যদিকে টিটন ও ইমন ছিলেন সম্বন্ধি — টিটনের বোন ইমনের স্ত্রী। এই আত্মীয়তার বাঁধন ছিন্ন হয়েছে রক্তপাতের মধ্যদিয়ে। ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত দশটায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সিটি পেট্রোল পাম্প ও বিজি প্রেসের মাঝের রাস্তায় মামুনের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। এতে মামুন গুরুতর আহত হন এবং তার মোটরচালক ভুবন চন্দ্র শীল নিহত হন। তৎকালীন মামুনের স্ত্রী সরাসরি ইমনের লোকজনকে এই হত্যাচেষ্টার অভিযুক্ত করেন। তবে মামুন বেঁচে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সকালে পুরান ঢাকার আদালত পাড়ার ন্যাশনাল মেডিকেলের সামনে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পাঁচ কিলারকে গ্রেফতার করলেও মামুন পরিবারের সন্দেহ ইমনের দিকেই রয়ে যায়। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল রাত আটটায় নিউমার্কেটের বটতলা এলাকায় শহীদ শাহনেওয়াজ হল সংলগ্ন রাস্তায় গুলিতে নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। নিহতের বড়ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন নিউমার্কেট থানায় মামলা করেন, যেখানে অজ্ঞাত ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়। তবে এজাহারে বসিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, কিলার বাদল, শাহজাহান ও ভাংগারী রনির সঙ্গে বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়। টিটন বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ বিরোধই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে ধারণা তদন্তকারী সংস্থাগুলোর।।ঘটনার পর পিচ্চি হেলাল একটি অডিও বার্তায় দাবি করেন, টিটনের সঙ্গে তাঁর চমৎকার সম্পর্ক ছিল এবং এই হত্যাকাণ্ডে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি অভিযোগ করেন, বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে তাকে টার্গেট করা হচ্ছে। হেলাল আরও দাবি করেন, বর্তমানে পুরো ঢাকা শহর নিয়ন্ত্রণ করছেন ইমন ও তাঁর ফোরস্টার গ্রুপ। তিনি ইমনকে সাইকো আখ্যা দিয়ে বলেন, টিটনকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে ইমন নিজের পারিবারিক সম্পর্ককেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। হেলালের দাবি, টিটন জীবদ্দশায় বারবার বলতো দুলাভাই ইমন তাঁকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে। নিহতের বড়ভাই রিপন পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে জানান, পিচ্চি হেলালের দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট। তিনি বলেন, তাদের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে এবং ইমনের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই। রিপনের অভিযোগ, বসিলা পশুর হাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি-নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেই হেলাল টিটনকে হত্যা করেছে। ইমামুল হাসান হেলাল হরফে( পিচ্চি হেলাল) ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারি গ্রেফতার হন। দীর্ঘ ২৪ বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। মুক্তির মাসখানেকের মাথায় মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার এলাকায় নাসির ও মুন্নাকে জোড়া খুনের ঘটনায় পৃথক দুই মামলায় তাকে আসামি করা হয়। মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, লালমাটিয়া এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিগত সরকার পতনের পর আত্মগোপনে চলে যাওয়া স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জায়গা দখল করে নিয়েছেন পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগীরা। কারাগারে থাকতেই তাঁর নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হতো। অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা সানজিদুল ইসলাম ইমন ধানমন্ডির গালকাটা জব্বার নামে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন। শখ করে অস্ত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে একসময় তিনি হয়ে ওঠেন দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি হত্যা মামলা রয়েছে, যার মধ্যে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইসলাম অশ্রু হত্যা উল্লেখযোগ্য। কারাগারে বসেই ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাজারীবাগের ট্যানারি ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন সাত্তারকে হত্যার নির্দেশ দেন ইমন। কারাগার থেকে মোবাইল ফোনে ভাড়াটে কিলার বুলুকে নির্দেশনা দেন — মেশিন পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, গুলি পেয়েছ ১৫টা, কামডা সেরে ফেল। এক মাসের পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। সাত্তার বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর জীবন হুমকির মুখে, তাই বাড়ি থেকে বের হওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু অপেক্ষায় অস্থির হয়ে পড়েন ইমনের সহযোগীরা। শেষ পর্যন্ত সাত্তারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখমের ঘটনা ঘটে। আহত হন কম্পিউটার সোসাইটির যুগ্ম সম্পাদক এহতেশামুল হক ও সভাপতি ওয়াহিদুল হাসান দিপু। ওয়াহিদুল হাসান দিপু পিচ্চি হেলালের আপন বড় ভাই। পুলিশ ও মামলার সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে পিচ্চি হেলাল ও ইমনের দ্বন্দ্ব। তবে ঐ সময় ইমনের মা সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন, ইমন তখন দেশের বাইরে রয়েছেন এবং তাঁকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জামিনে মুক্ত হয়ে ইমন বিদেশে চলে গেছেন। মাল্টিপ্ল্যান মার্কেটের সভাপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে দিপু বিজয়ী হওয়ায় হয়তো তিনিই এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন ইমনের মা। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের চার শীর্ষ সন্ত্রাসী ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে আবার ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকার ১৯ জন সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। অর্থাৎ দুই দফায় ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত সেই তালিকার ১১ জন সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ১৫ই আগস্ট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ইমন, ১৩ই আগস্ট টিটন, এবং ১৬ই আগস্ট হেলাল মুক্তি পান। দেশের পুলিশ ও প্রশাসনে স্থবিরতার সুযোগে জামিন পাওয়া ওই সন্ত্রাসীরা এখন কোথায় আছেন — দেশে নাকি বিদেশে — তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন দেশজুড়ে। একসময় ইমন, মামুন, টিটন, পিচ্চি হেলাল সবাই একই গ্রুপে ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ২৬ বছরের দ্বন্দ্ব তাদের রক্তের সম্পর্ককেও ছিন্ন করেছে। পিচ্চি হেলালের অভিযোগ, ইমনের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতেই টিটনকে টার্গেট করা হয়েছে। অন্যদিকে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, হেলালই টিটন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। টিটন হত্যার দেড় মাস আগেই তিনি ভাইকে জানিয়েছিলেন, হেলাল তাঁকে হত্যার নীলনকশা তৈরি করছে। ইমন ও পিচ্চি হেলালের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের জের ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, রক্তারক্তি ও হত্যাকাণ্ড বেড়েই চলেছে। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া এসব তারকা সন্ত্রাসীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন কি না, নাকি আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মেতে উঠবেন — তা নিয়ে সচেতন মহলে উদ্বেগের শেষ নেই। ( তথ্য সংগৃহীত)
https://slotbet.online/