বিশেষ প্রতিবেদন: একজন লড়াই করছেন দুর্গম পাহাড়ের জরাজীর্ণ এক বিদ্যালয়ে শিক্ষার আলো টিকিয়ে রাখতে, অন্যজন সমতলে বুকের রক্ত চাক্ষুষ করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন মাদকের অন্ধকার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। প্রতিকূলতা ভিন্ন হলেও লক্ষ্য তাদের এক—সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করা। তারা হলেন বান্দরবানের থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন এবং ঢাকার সাভারের দেওগাঁওয়ের সাহসী সমাজকর্মী জেমস কাজল গোমেজ। সম্প্রতি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে এই দুই অকুতোভয় বন্ধুর আত্মত্যাগ ও লড়াইয়ের গল্প দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
পাহাড়ের আলো: সাঙ্গুর বুক চিরে শিক্ষক বামং খিয়াংয়ের সংগ্রাম
বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অর্থসংকটে বন্ধের উপক্রমে পড়েছিল। ৫৬ জন দরিদ্র শিক্ষার্থীর এই বিদ্যাপীঠে যখন শিক্ষকদের বেতন দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন আলোর মশাল নেভাতে দেননি প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন।
ছুটির দিনগুলোতে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাহাড়ি নদী সাঙ্গুর উত্তাল স্রোতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন শুরু করেন তিনি। নৌকা চালিয়ে উপার্জিত অর্থের সিংহভাগই তুলে দিতেন সহকর্মীদের হাতে, যাতে পাহাড়ের শিশুদের পড়াশোনা থমকে না যায়।
তার এই অনন্য আত্মত্যাগের গল্প গণমাধ্যমে আসার পর তা নাড়া দেয় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে। অবশেষে গত ২৮ জুন মহান সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হচ্ছে। শিক্ষকের বৈঠার চাকা আজ পাহাড়ের তিন্দু এলাকার অন্ধকার ভবিষ্যৎকে পার করে আলোর বন্দরে পৌঁছে দিয়েছে।
সমতলের যোদ্ধা: মাদকের বিরুদ্ধে কাজল গোমেজের আপসহীন লড়াই
বন্ধু যখন পাহাড়ে শিক্ষার আলো জ্বালাচ্ছেন, তখন সমতলে সাভারের দেওগাঁও গ্রামে মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখেছেন জেমস কাজল গোমেজ। নিজের ফেসবুক আইডি থেকে স্থানীয় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী পোস্ট করায় গত ১০ এপ্রিল একদল সন্ত্রাসী মব তৈরি করে কাজলকে বেধড়ক মারধর করে গুরুতর জখম করে। উল্টো মিথ্যা মামলায় তাকে জেলহাজতেও পাঠানো হয়।
জামিনে মুক্ত হওয়ার পরও কাজল নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন, কিন্তু তাকে দমানো যায়নি। তার এই অদম্য প্রতিবাদের জের ধরেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সাভার এলাকার ত্রাস, সাবেক ছাত্রদল নেতা ও হত্যা-মাদকসহ একাধিক মামলার প্রধান আসামি মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ‘ফেন্সি সামির’ এবং তার ভাই ‘ফর্মা হৃদয়’ একে একে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে গ্রেপ্তার হয়। গত ২ জুলাই ঢাকা জেলা উত্তর ডিবি পুলিশ সদরঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সামিরকে গ্রেপ্তার করলে সাভারবাসীর মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে।
দুই বন্ধুর এক লক্ষ্য: সমাজ পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা
ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই দুই বন্ধু আজ সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম কারিগর। একজন পাহাড়ের শিশুদের খাতা-কলম সচল রাখতে নিজের হাতে নৌকার হাল ধরেছেন, অন্যজন সমতলের সমাজকে মাদকমুক্ত করতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন।
”সমাজকে বদলাতে হলে ঘরের কোণে বসে থাকলে চলে না, কাউকে না কাউকে তো হাল ধরতেই হয়।” — এই নীতিকে বুকে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছেন বামং খিয়াং ও কাজল গোমেজ।
একজনের ত্যাগে জাতীয়করণের গৌরব পেয়েছে অবহেলিত এক পাহাড়ি বিদ্যালয়, আর অন্যজনের সাহসিকতায় সাভারের এক কুখ্যাত মাদক সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে। এই দুই বন্ধুর গল্প আজ প্রমাণ করে—ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও সততা থাকলে একা লড়েও সমাজের বুকে বিশাল পরিবর্তন আনা সম্ভব। সমাজ গড়ার এই দুই অনন্য নায়ককে স্যালুট।
https://slotbet.online/