নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স শাখার কর্মচারী মোঃ আমিন খানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধীচক্রকে পৃষ্ঠপোষকতার ভয়ঙ্কর চিত্র এখন প্রকাশ্যে এসেছে। সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে বহু বছর ধরে পরিচালিত এক অদৃশ্য দুর্নীতির রাজ্যকে আমিন তার ব্যক্তিগত ব্যবসায় পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরবাসী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার একচ্ছত্র দাপট।
সাবেক মেয়র কামালের আমলে নিয়োগ পাওয়া আমিন বর্তমানে লাইসেন্স শাখায় কর্মরত থাকলেও তার প্রভাব কাগজ-কলমের দায়িত্বের বহু গুণ বেশি। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স শাখার ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি বরিশাল নগরীর অবৈধ ভাঙারী ব্যবসায়ীদের নিয়মিত মাসিক চাঁদার বিনিময়ে সুবিধা দিয়ে আসছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব ভাঙারী দোকানের বেশিরভাগেরই নেই সঠিক ট্রেড লাইসেন্স; আর যাদের লাইসেন্স আছে, তাদেরও নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এই ঘাটতিই আমিনের জন্য হয়ে ওঠে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক উৎস।
অভিযোগ অনুসারে, আমিন ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দোকানপাট ভেঙে ফেলা, মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখানো কিংবা লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করেন। এই ভাঙারী দোকানগুলোই শহরে চুরি ও ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। চোরাই মালামাল কেনাবেচায় এসব দোকানকে নিরাপদ জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেদিক বিবেচনায় আমিন মাসে মাসে এই চোরাই অর্থনীতির সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছেন, যা তাকে বরিশালের অপরাধ জগতের এক ধরনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিণত করেছে। নগর ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কার্যক্রম কেবলমাত্র সরকারি রাজস্বই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং নগরজুড়ে অপরাধ, বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্সের মতো একটি সরকারি নথিকে ব্যক্তিগত বাণিজ্যে পরিণত করা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। অবৈধ ব্যবসা ও অপরাধীচক্রকে বৈধতার মুখোশ পরিয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে আমিনের ভূমিকা বরিশালের সুশাসনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলেই মনে করছেন জানা-অজানা অনেকেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায় ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মেয়র সাদেক আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠতার সুযোগে আমিন এবং তার নেটওয়ার্ক আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সেই সময়কার রাজনৈতিক ছায়াতলে দুর্নীতির যে অটল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা আজও পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। বরং আমিনের কর্মকাণ্ড থেকে ধারণা পাওয়া যায়—তিনি এখনও নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে নগরের প্রশাসনিক কাঠামোকে ব্যবহার করছেন নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য। আমিন ও তার এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল হয়েছে সিটি কর্পোরেশন প্রশাসকের কাছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তারা বরিশালের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতি মাসে দুলাখ টাকারও বেশি চাঁদা তোলেন।
বরিশালের সাধারণ মানুষের দাবি, আমিন খানের মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নগরের সার্বিক সেবাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বছরের পর বছর ধরে জনগণের ওপর অত্যাচার চালানো, চাঁদাবাজি করে সম্পদশালী হওয়া এবং নগর ব্যবস্থাপনাকে ধ্বংস করে দেওয়া এই কর্মকর্তা ও তার নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনাই এখন জরুরি। তাদের মতে, আমিনের অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া সিটি কর্পোরেশনের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
https://slotbet.online/