ডেস্ক নিউজ: বরিশাল নগরীর মাদক চক্রের অন্ধকার জগতে দেড় যুগ ধরে রাজত্ব করা মান্নাসুমন ও তার স্ত্রী শিল্পীর মাদক সাম্রাজ্য অবশেষে ভেঙে পড়ল পুলিশের সুপরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক অভিযানের মুখে। ইয়াবা, গাঁজা ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এই দম্পতি এলাকায় এক ধরনের অঘোষিত ক্ষমতা কায়েম করেছিল। স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠা এই দম্পতির পতন বরিশালে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে এক বড় সাফল্য।
গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে বরিশাল নগরীর চড়কাউয়া খেয়াঘাট এলাকায় মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে প্রথমে ধরা পড়ে মান্নাসুমন। এসআই ফিরোজের নেতৃত্বাধীন গোয়েন্দা দলটি একটি R15 মোটরসাইকেলসহ সুমনকে আটকের পর জানতে পারে সে কাউনিয়া থানার মাদক ও অস্ত্র মামলার পলাতক আসামি। সুমনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদকচক্র পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে থাকা এক চতুর অপরাধী। পরবর্তীতে কাউনিয়া থানার অফিসার ইন চার্জ এর সহায়তায় থানার একটি দল এসে তাকে হেফাজতে নেয় এবং তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর আসামী হিসেবে আটক দেখানো হয়। এর আগের
বড় ধাক্কাটি আসে ৭ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে, যখন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কাউনিয়া থানা পুলিশ সুমনের স্ত্রী শিল্পীকে আটক করতে সমর্থ হয়। দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তা ও ব্যবসার স্বার্থে এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছিল, যা তাদের গ্রেপ্তারের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল। পুলিশ এলাকা ঘেরাও করলে সুমন পালাতে সক্ষম হলেও শিল্পীকে আটক হতে হয়। পুলিশের সহকারী কমিশনার পবিএ কুমার হালদারের নেতৃত্বে পলাশপুরের মোহাম্মদপুর এলাকায় যে অভিযানে শিল্পী ধরা পড়ে, সেটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দম্পতির মাদক সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চারদিকেই নজরদারির ব্যবস্থা ছিল। তবুও পুলিশের কৌশলগত অগ্রগতির সামনে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় তাদের সব প্রস্তুতি। স্থানীয়দের উপস্থিতিতে বসতঘর তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ১০২ পিস ইয়াবা, গাঁজা, মাদক বিক্রির নগদ ২০ লক্ষাধিক টাকা এবং দেশীয় অস্ত্র। পুরো বাড়িটি যেন মাদক বাণিজ্যের এক অঘোষিত আস্তানায় পরিণত হয়েছিল—এমন চিত্রই সামনে আসে তখন। আটক শিল্পীকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এই দম্পতি শুধু মাদক ব্যবসাই নয়, বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেনের সাথেও জড়িত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে পূর্বের অস্ত্র ও মাদক মামলার পাশাপাশি মানি লন্ডারিং আইনে নতুন মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘদিন ধরে আইনের হাতছানি এড়িয়ে চলা এই দম্পতির ওপর অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে দৃঢ় হাতে নেমেছে—তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে পুরো অভিযানে।
বরিশাল মহানগর পুলিশের বর্তমান কমিশনার শফিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শহর থেকে মাদক চক্রের শেকড় উপড়ে ফেলতে কঠোর নির্দেশনা দেন। তার নির্দেশনার ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ ও থানা পর্যায়ের ইউনিটগুলো আলাদা তালিকা করে বিভিন্ন চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। মান্না–শিল্পী দম্পতির বিরুদ্ধে এই অভিযান সেই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে উঠে এসেছে, যা গোটা বরিশালবাসীকে আশ্বস্ত করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের মতে, অপরাধী যত শক্তিশালী ও চতুরই হোক না কেন, একদিন না একদিন আইনের হাতকড়ায় আবদ্ধ হবেই—মান্নাসুমন ও শিল্পী গ্রেপ্তারই তার স্পষ্ট প্রমাণ।
https://slotbet.online/