নিয়াজ শেখ : চারপাশের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছিল এক অন্যায্য নিষ্ঠুরতায়। বিদ্যুতের নিষ্ঠুর খুঁটিতে শক্ত করে বাঁধা এক অসহায় পিতা, আর তাকে ঘিরে কৌতূহলী জনতার ভিড়। উজিরপুরের সেই চত্বরে সেদিন মানবতার পরাজয় ঘটেছিল, কিন্তু হেরে যায়নি ৯ বছরের ছোট্ট একটি শিশু। উজিরপুরের অনিক সরদার যখন চুরির অপবাদে পশুর মতো প্রহৃত হচ্ছিলেন, তখন হাজারো দর্শকের ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসেছিল একটি ছোট্ট অবয়ব—তার মেয়ে তুবা।
নয় বছরের তুবার কাছে তখন কোনো বিচার-সালিশের হিসাব ছিল না, ছিল না কোনো ভয়ে পিছিয়ে যাওয়ার উপায়। পকেট থেকে কুড়ানো কয়েকটা টাকায় কেনা এক টুকরো রুটি আর এক কাপ চা নিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল রক্তাক্ত বাবার সামনে। নিজের ছোট্ট হাতে রুটি ছিঁড়ে যখন সে বাবার তৃষ্ণার্ত, ব্যথাতুর মুখে তুলে দিচ্ছিল, তখন সেই রুটির টুকরো ভিজে যাচ্ছিল তুবার চোখের জলে। এক অবুঝ শিশুর সেই আকুলতা সেদিন থমকে দিয়েছিল চারপাশের হিংস্রতাকে। অপমানের সাগরে ভাসতে থাকা এক বাবার কাছে সেই এক টুকরো রুটি যেন ছিল পৃথিবীর সবচাইতে বড় আশ্রয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই করুণ দৃশ্য কাঁদিয়েছে পুরো দেশকে। কিন্তু চোখের জলের সেই গল্পে শেষ পর্যন্ত যুক্ত হলো এক মানবিক অধ্যায়। যে অবুঝ হাতটি সেদিন বাবার মুখে রুটি তুলে দিয়ে মানবতাকে লজ্জা দিয়েছিল, আজ সেই হাতটি পরম স্নেহে চেপে ধরলেন উজিরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। গত চার মাস ধরে স্কুলের মুখ না দেখা তুবার হাত ধরে তিনি নিজে হেঁটে গেলেন বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে। বাবার গায়ের রক্তের দাগ মুছে দিয়ে তুবাকে আবার তার সহপাঠীদের মাঝে ফিরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য দেখে চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ইউএনও কেবল তুবাকে স্কুলেই পৌঁছে দেননি, তুবার পড়াশোনার সার্বিক দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি তার নামে একটি বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করেছেন, যেন দেশ-বিদেশের মানুষের ভালোবাসা সরাসরি পৌছে যায় তার সুসংহত ভবিষ্যতে। এদিকে, অন্ধকারে ডুবে যাওয়া পরিবারটিকে আলোয় ফেরাতে নেওয়া হয়েছে স্থায়ী পদক্ষেপ। তুবার বাবার মাদকাশক্তির সুচিকিৎসার জন্য তিন মাসের নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করছে উপজেলা প্রশাসন। আর পরিবারটি যেন আর কখনও অভাবের কাছে মাথা নত না করে, সে জন্য তুবার মায়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
যে শিশুটি কয়েকদিন আগেও লোকলজ্জা আর অপমানের ভয়ে কেঁদে কেঁদে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিল, আজ সে আবার হাতে তুলে নিয়েছে নতুন বই। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার এমন দরদী স্পর্শ প্রমাণ করল—হৃদয়হীনতার এই শহরে এখনও নিঃশ্বাসের মতো বেঁচে আছে সহানুভূতি।
তুবার সেই ছোট্ট হাত সেদিন বাবাকে শুধু রুটিই খাইয়ে দেয়নি,সমাজকে দিয়েছিল এক ভালোবাসার বার্তা। আর আজ সেই হাত ধরে এক নতুন ভোরের দিকে হেঁটে গেল পুরো একটি পরিবার।
https://slotbet.online/