• মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
*পরকীয়া; একটি ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি* ৫ নম্বর ওয়ার্ড সচিব জসিমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ! বরিশাল পলাশপুর এলাকায় বাবুর সাহসিকতায় মাদকের বিরুদ্ধে তরুণদের দৃষ্টান্তমূলক প্রতিরোধ গঠন। ব্যক্তিগত সুদের চুক্তি বা চেকের আইনি বৈধতা নেই: জেনে নিন বৈধ ক্ষুদ্রঋণের নিয়ম সিএমপি মেট্রোপলিটন পুলিশে ব্যাপক রদবদল। বরিশালে কোতোয়ালি থানা পুলিশের অভিযান: নারীসহ ৫ মাদক ব্যবসায়ী আটক, ইয়াবা ও মোটরসাইকেল উদ্ধার ব্যাংক হিসাবে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব: নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব ও উত্তরণের উপায় ৫ জেলায় নতুন এসপি, পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১২ কর্মকর্তাকে বদলি বরিশাল কাউনিয়ায় ২০০ পিস ইয়াবাসহ এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার। জিমেইল হ্যাক করে ব্যাংক ও এমএফএস থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ২

*পরকীয়া; একটি ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি*

প্রতিনিধি / ২৮ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ: পরকীয়া হলো বিবাহিত কোনো ব্যক্তির (নারী বা পুরুষ) নিজের বৈধ জীবনসঙ্গী বা স্বামী-স্ত্রীকে গোপন রেখে অন্য কারও সাথে প্রেম, রোমান্স বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। এটি অত্যন্ত অসামাজিক ও নৈতিকভাবে অনৈতিক এবং বিশ্বাসভঙ্গের একটি বড় রূপ। বিবাহিত জীবনে স্বামী বা স্ত্রী ব্যতীত অন্য কারো সাথে বিবাহবহির্ভূত প্রেমের সম্পর্ক স্থাপনই হলো পরকীয়া। এটি শুধুমাত্র একটি নৈতিক স্খলনই নয় বরং বর্তমান সমাজে এটি পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি মারাত্মক ও ভয়ানক ব্যাধি। সহজ কথায়, পরকীয়া হলো বিবাহিত কোনো নারী বা পুরুষের নিজ স্বামী বা স্ত্রী ব্যতীত অন্য কারো সাথে বিবাহবহির্ভূত প্রেম বা যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া। এটি মানসিক, দৈহিক বা উভয় ধরনেরই হতে পারে। বর্তমান সময়ে আলোচিত ব্যাধি পরকীয়া। পরকীয়া একটি অমানবিক বিকৃত মানসিকতার কাজ। শরিয়তের পরিভাষায় পরকীয়া হলো, বিয়ের পরে কারো সঙ্গে কোনো ধরনের প্রেম-ভালোবাসা এবং দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা। ইসলাম পরকীয়াকে সম্পূর্ণরুপে হারাম করা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মেও পরকীয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরকীয়া মানবতাবিরোধী একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ। এই জঘন্য কাজটি বর্তমান সমাজে লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার ন্যায় ছুটে চলেছে। যার প্রচণ্ড খুরের আঘাতে সমাজ ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইসলাম ধর্মসহ অন্য কোন ধর্মেই পরকীয়ার মত অমানবিক ও গর্হিত কাজকে অনুমোদন দেয়নি। সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো নারী-পুরুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হতে পারে না। পরকীয়া সম্পর্কে যেমন সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয়, তেমনি পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে। পরকীয়া নামের অসামাজিক বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অশুভ ছোবলে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সংসার ও পরিবার। সমাজের নিম্ন স্তর থেকে উচ্চ স্তরের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে এই ঘৃণ্য স্বভাব বিদ্যমান আছ। পরকীয়ার ফলে স্বামী-স্ত্রীর দুই পরিবারে সম্পর্কের টানাপোড়নের সাথে সাথে তৃতীয় আরেকটি পরিবারেও অশান্তির সৃষ্টি হয়। সমাজে ব্যাপক বিস্তরণশীল এই ব্যাধির জন্য দায়ী কে? শুধুই কি ব্যক্তি? হ্যাঁ ব্যক্তির নোংরা মানসিকতার দায়বদ্ধতা অবশ্যই আছে যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে অনেক জঘন্য হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হচ্ছে। পরকীয়ার বলি হয়ে অনেকে সংসারের অশান্তি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

বিভিন্ন কারণে পরকীয়া সংঘটিত হয়ে থাকে। যেমন; একসঙ্গে না থাকা, পরনারী বা পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করা, ধৈর্য ধারণ না করা, অশ্লীল বিনোদন দেখা, অতিরিক্ত বাইরে যাওয়া, ধর্মীয় জ্ঞান না থাকা, অলস ও কর্মহীন জীবনযাপন করা ইত্যাদি। ফেসবুকে বিভিন্ন অচেনা নারী পুরুষের সাথে দিনের পর দিন চ্যাটিং এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একাধিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, এই সম্পর্কই এক সময়ে রুম ডেটিং এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের দিকে গড়াচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা নষ্ট সংস্কৃতির অন্ধানুসরণ, ভারতীয় বাংলা-হিন্দি সিনেমা এবং সিরিয়ালের ব্যাপক বিস্তরণ, ইন্টারনেট-ফেসবুক এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অপব্যবহারের দরুন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্মানবোধ, ভালোবাসা, আত্মোবিশ্বাস উঠে গেছে। নগ্ন নারী-পুরুষ মডেলের কামুক আবেদনময়ী সৌন্দর্য যখন স্বামী অথবা স্ত্রী দেখছে তখন নিজের স্ত্রী/স্বামীর সৌন্দর্য আর তাকে তৃপ্তি দিতে পারছে না। ঠিক তখনই এরা পরকীয়ার মতো ভয়ঙ্কর সমাজবিরোধী পথ বেছে নিচ্ছে। দাম্পত্য সম্পর্কে অতৃপ্তি, মানসিক শূন্যতা, একঘেয়েমি এবং রোমাঞ্চের খোঁজে মানুষ সাধারণত পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। এটি কেবল নৈতিক স্খলন নয় বরং জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা জটিল কারণেও মানুষ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে আকৃষ্ট হতে পারে। মনোবিজ্ঞান এবং গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পরকীয়ায় জড়ানোর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, দাম্পত্য জীবনে অবহেলা ও দূরত্ব; দাম্পত্য সঙ্গীর সাথে বোঝাপড়ার অভাব, অতিরিক্ত ব্যস্ততা বা দীর্ঘদিন ধরে আবেগ ও ভালোবাসার আদান-প্রদান না থাকলে মানসিক শূণ্যতা তৈরি হয় বিধায় অনেকেই মানসিক শূণ্যতা দূর করার জন্য পরকীয়ায় জড়িয়ে থাকেন। শারীরিক বা মানসিক অতৃপ্তি; দাম্পত্য জীবনে ও যৌন জীবনে অসামঞ্জস্যতা বা মানসিক ও শারীরিক চাহিদা পূরণ না হলে অনেকেই বাইরের সম্পর্কে শান্তি খোঁজেন। রোমাঞ্চ ও নতুনত্বের খোঁজ; দীর্ঘদিন একই সঙ্গীর সাথে সংসার করতে করতে সম্পর্কে অনেকের একঘেয়েমি চলে আসে। অনেকে সেই একঘেয়েমি কাটাতে নতুন উত্তেজনার সন্ধানে পরকীয়ায় জড়ান। সঙ্গীর বদভ্যাস বা নির্যাতন; সঙ্গীর অতিরিক্ত সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরকীয়া বা শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কারণেও অনেকে সম্পর্ক থেকে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে অন্য কারও প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ডিজিটাল মাধ্যমের সহজলভ্যতা; অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডেটিং অ্যাপের কারণে অপরিচিত মানুষের সাথে যোগাযোগ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে যা মানুষের মধ্যে পরকীয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা; কারো কারো ক্ষেত্রে নতুন সম্পর্কে জড়ানোর বা মনোযোগ পাওয়ার এক ধরণের আসক্তি থাকে, যাকে জটিল জৈবিক কারণ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর পেছনে শুধুমাত্র সামাজিক বা মানসিক কারণই নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর পেছনে নির্দিষ্ট জেনেটিক (বংশগত) প্রবণতারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেমন; কোন পিতা যদি পরকীয়ায় জড়ায় তাহলে তার ছেলের জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে এবং ছেলেও একসময় পরকীয়ায় জড়িয়ে যেতে পারে। আবার কোন মা যদি পরকীয়ায় জড়ায় তাহলে তার মেয়ের জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে এবং মেয়েও একসময় পরকীয়ায় জড়িয়ে যেতে পারে। আমেরিকার বিংহ্যামটন ইউনিভার্সিটি (সানি) এবং কিনসি ইনস্টিটিউটের এক বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মাঝে পরকীয়ার এই জিনের রূপটি থাকে, তারা পরকীয়ায় জড়ানোর এবং একাধিক বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। মানুষের শরীরে ’অক্সিটোসিন’ এবং ’ভেসোপ্রেসিন’ নামক এই দুটি হরমোন মানুষের মধ্যে বিশ্বস্ততা, ভালোবাসা এবং সামাজিক বন্ধন তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করে। মানুষের জিনগত গঠনে এই হরমোনগুলোর রিসেপ্টর বা গ্রাহক কোষে তারতম্যের কারণে কারো কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রতি একঘেয়েমি চলে আসে এবং তারা নতুনত্বের খোঁজে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়তে পারেন। তবে জিন সরাসরি কাউকে প্রতারণা করতে বাধ্য করে না বরং মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিবেশ এবং নিজের বিবেকতাড়িত সিদ্ধান্তই মানুষের চূড়ান্ত আচরণ নির্ধারণ করে থাকে। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত গণ্ডির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর গভীর ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে পুরো সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থার উপর। পরকীয়ার ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে অবিশ্বাস ও সন্দেহ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনায় রূপ নেয়। এতে একটি সুন্দর পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে যায়। পিতা-মাতার পরকীয়া ও এর ফলে সৃষ্ট কলহের কারণে শিশুরা চরম মানসিক বিষণ্ণতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এর পরিণামে অনেক সময় তাদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে সমাজে খুন, গুম, পারিবারিক নির্যাতন এবং আত্মহত্যার মতো জঘন্য অপরাধগুলো আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। পরকীয়া সমাজের মৌলিক মূল্যবোধ ও নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। বিবাহিত জীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ ও কমিটমেন্টের অভাব নতুন প্রজন্মের মধ্যেও নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে। পরকীয়াকে কেন্দ্র করে দুই বা ততোধিক পরিবারের মাঝে শত্রুতা, মারামারি ও দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, যা সামগ্রিক সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। যারা পরকীয়া করে তাদের সমাজের কেউ বিশ্বাস করে না, তাদেরকে সমাজের নোংরা কীট নামে অভিহিত করা হয়। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত কঠোর। সমাজে এই ধরনের কাজকে সাধারণত অনৈতিক ও অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার ফলে পরকীয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের সমাজে গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সম্মানহানি ঘটে এবং সমাজের সবাই তাদের কঠোরভাবে সমালোচনা করে থাকেন। পরকীয়া শুধু একটি নৈতিক বা মানসিক সমস্যা নয়, এটি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থনীতিতে গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াই এবং সংসার ভেঙে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। পরকীয়ায় লিপ্ত ব্যক্তিরা সঙ্গীকে লুকিয়ে উপহার দেওয়া, ডেটিং, বিলাসবহুল ভ্রমণ এবং হোটেল বা রিসোর্টে যাতায়াতের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন। অনেক সময় অতিরিক্ত খরচের কারণে নিজের বা পরিবারের জমানো মূলধন বা সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যায়। অবৈধ সম্পর্কের জেরে অনেকেই পরকীয়ার সঙ্গীকে খুশি করতে নিজের অজ্ঞাতেই পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তর করেন। এছাড়াও, অনৈতিক সম্পর্কের ভিডিও বা ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল (ফাঁদ) করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে থাকে। অনেকে অফিসের সময় নষ্ট করে পরকীয়ায় সময় দেওয়া, মোবাইলে ব্যস্ত থাকা বা মানসিক অস্থিরতায় ভোগার কারণে কর্মক্ষেত্রে কাজের গুণগত মান কমে যায়, এর ফলে পদোন্নতি ব্যাহত হওয়া বা চাকরি হারানোর মতো অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। পরকীয়া সংসার ভাঙার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে উকিলের ফি, দেনমোহর বা খোরপোশ পরিশোধ করা এবং দাম্পত্য সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়। বিবাহ বিচ্ছেদ বা পারিবারিক ভাঙনের পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও ভরণপোষণের ব্যয় বহন করা নিয়ে আইনি ও অর্থনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়।

ইসলাম ধর্মে পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিবাহিত জীবনের পবিত্রতা রক্ষা এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা রোধ করতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বেশ কিছু সতর্কবার্তা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “চোখের ব্যভিচার হলো (কামনা নিয়ে) তাকানো, কানের ব্যভিচার হলো শোনা, মুখের ব্যভিচার হলো কথা বলা, হাতের ব্যভিচার হলো স্পর্শ করা এবং পায়ের ব্যভিচার হলো হাঁটা (খারাপ উদ্দেশ্যে গমন করা)। আর অন্তর কামনা ও আকাঙ্ক্ষা করে, অতঃপর যৌনাঙ্গ তা বাস্তবায়ন করে বা মিথ্যা প্রমাণিত করে।” (সহিহ মুসলিম)। একবার আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি? নবীজি (সা.) বিভিন্ন পাপের কথা উল্লেখ করার পর বলেন একটি হলো, “তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও সতর্ক করেছেন যে, কোনো পুরুষ যেন কোনো মাহরাম (বিবাহযোগ্য) নারীর সাথে নির্জনে বা গোপনে দেখা না করে। হাদিসে এসেছে, যখন কোনো পুরুষ ও নারী নির্জনে মিলিত হয়, তখন তৃতীয়জন হিসেবে সেখানে শয়তান উপস্থিত থাকে।পরকীয়া কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, এটি বিশ্বাসঘাতকতাও। পরকীয়ার পথ রোধ করতে ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা অটুট রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পরকীয়ার এই ভয়ঙ্কর ব্যাধি ঠেকাতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বস্ত সঙ্গীর সঙ্গ নিতে হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নির্দেশ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’ ( সুরা তাওবা- আয়াত নং ১১৯)। আমাদের দেশে ভয়ঙ্কর ব্যাধি পরকীয়ার জন্য ভেঙ্গে যাচ্ছে সামাজিক ও পারিবারিক জীবন। পরকীয়ার ফাঁদে আটকা পড়ে বলি হচ্ছে নিরপরাধ সন্তান, স্বামী অথবা স্ত্রী। পরকীয়ার পথে বাঁধা হওয়ায় নিজ সন্তানকেও নির্মমভাবে হত্যা করছেন তার মমতাময়ী মা কিংবা বাবা। আবার কেউ বা পুঁতে রেখেছেন বাড়ির আঙিনায় কিংবা খাটের নিচে। বর্তমানে পত্রিকার পাতা খুলতেই চোখে পড়ে এমন সব খবর। ইসলামে পরকীয়া ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার জন্য নারী-পুরুষকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, এতে করে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে; তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।” (সুরা আহজাব- আয়াত নং ৩২ ও ৩৩)। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে, নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং নিজ নিজ চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা আন-নুর, আয়াত নং ৩০ ও ৩১)। পুরুষ-নারী সবাইকে চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ নির্দেশ করেছেন, ”তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হোয়ো না। এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ।” (সুরা বনি ইসরাইল- আয়াত নং ৩২)।ইসলাম ধর্ম ছাড়াও পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়াকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্ম মতে, হিন্দু ধর্মে বিবাহকে একটি পবিত্র আধ্যাত্মিক মিলন হিসেবে মানা হয়। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ও মনুসংহিতা অনুযায়ী পরকীয়া বা ব্যভিচার একটি গর্হিত পাপ এবং অপরাধ। ভগবদ্গীতায় উল্লেখ আছে যে, বিবাহিত জীবনের বাইরে অবৈধ সম্পর্ক পারিবারিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে। তাই আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি খারাপ কর্ম হিসেবে গণ্য হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পরজন্মেও ভোগ করতে হয়। খ্রিস্টান ধর্ম মতে, বাইবেলের ১০টি আদেশের মধ্যে অন্যতম হলো, “ব্যভিচার করিও না”। খ্রিস্ট ধর্ম অনুযায়ী, বিবাহ হলো ঈশ্বর কর্তৃক পবিত্র বন্ধন। বিবাহবহির্ভূত যেকোনো শারীরিক বা মানসিক সম্পর্ক একটি বড় ধরনের পাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্যাথলিক চার্চ এই ধরনের সম্পর্কের কারণে বিবাহবিচ্ছেদ অনুমোদন করে না। বৌদ্ধ ধর্ম মতে, বৌদ্ধ ধর্মে নৈতিক জীবনযাপনের জন্য পাঁচটি মূল নিয়ম বা ‘শীল’ রয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় শীলটি হলো, ব্যভিচার বা অসদাচরণ থেকে বিরত থাকা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে, পরকীয়া শুধুমাত্র অপরের ক্ষতি করে না, এটি মিথ্যাচার এবং চরম আসক্তি বা লোভের প্রকাশ, যা মানুষের নির্বাণ বা মুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে। ইহুদি ধর্ম মতে, ইহুদি ধর্মে পরকীয়াকে নৈতিক ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত জঘন্য পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটিকে বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধের পাশাপাশি ঈশ্বরের নিয়মের লঙ্পরকীয়ার শাস্তি মূলত নির্ভর করে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বা আইনে কি বলা হয়েছে তার ওপর। বাংলাদেশের আইনে পরকীয়ার জন্য সরাসরি কোনো শাস্তির বিধান নেই। বাংলাদেশে দন্ডবিধি (আইন) ১৮৬০ এর ৪৯৭ ধারায় পরকীয়ার একটি অংশকে মাত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আছে যার নাম ব্যভিচার। সেটি হলো, কোনো বিবাহিত নারীর সাথে তার স্বামী নয় এমন কোনো পুরুষ যদি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তবে সেটি অপরাধ হবে। এই অপরাধে পুরুষটির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে যে পুরুষ সম্পর্ক স্থাপন করে সে অপরাধী কিন্তু বিবাহিত নারীকে অপরাধী এবং অপরাধের সহযোগী করা হয় নাই। অন্য দিকে কোনো বিবাহিত পুরুষ যদি অন্য কোনো নারীর সাথে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপণ করে তবে এটিকে অন্যায় কিংবা অপরাধ করা হয় নাই। যার ফলে বিবাহিত পুরুষেরা এখানে সেচ্ছাচারী হতে পারে যা সাংবিধানিক আইনের সমতা বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য দণ্ডবিধির এই ৪৯৭ ধারা কার্যকর ছিল। তবে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এবং নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে পরকীয়ার জন্য সরাসরি ফৌজদারি মামলা করার সেই পুরোনো আইনি কাঠামো বর্তমানে আর কার্যকর নেই। তাই কোনো স্ত্রী যদি পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন, তবে বাংলাদেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী স্বামী সরাসরি স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার মামলা করতে পারেন না, তবে স্ত্রী যদি স্বামীর বিনা অনুমতিতে অন্য কাউকে বিয়ে করেন, তবে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব। পরকীয়ার জেরে বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্স চাইলে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রী উভয়েরই তালাক দেওয়ার অধিকার রয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী স্ত্রী বা স্বামী এর জেরে তালাক বা ডিভোর্স দিতে পারেন এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করার আইনি অধিকার রাখেন। ইসলাম ধর্মে পরকীয়া বা ব্যভিচারকে কবিরা গুনাহ (বড় পাপ) হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, বিবাহিত নারী বা পুরুষের ব্যভিচারের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর (মৃত্যুদণ্ড বা পাথর নিক্ষেপ)। তবে এই শাস্তি কার্যকরের জন্য কঠোর সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মেও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে নৈতিকতা পরিপন্থী ও পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে বাঁচার জন্য এবং এর করাল গ্রাস থেকে বের হয়ে আসার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় মানসিক সিদ্ধান্ত, বাস্তবতার উপলব্ধি এবং সঙ্গীর সাথে খোলামেলা আলোচনা। নিজেকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করতে ও সুস্থ দাম্পত্য জীবনে ফিরতে নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। পরকীয়া থেকে বেরিয়ে আসার কার্যকরী উপায় হলো, দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো অবৈধ এবং অনৈতিক এই সম্পর্কটি চিরতরে ছিন্ন করার মানসিক জোর তৈরি করা। পরকীয়া সম্পর্কে থাকা তৃতীয় ব্যক্তির সাথে সমস্ত রকম যোগাযোগ (মোবাইল, ফেসবুক-সোশ্যাল মিডিয়া, সরাসরি সাক্ষাৎ) পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। পরকীয়ার জন্য অজুহাত খোঁজা বা অন্যকে দোষারোপ না করে, নিজের ভুল স্বীকার করে দায়িত্ব নিতে হেবে। নিজের বৈধ সঙ্গীর সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। তাকে সময় দিতে হবে, তার ভালোলাগা-মন্দলাগাগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং দাম্পত্য জীবনে রোমান্স ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। দাম্পত্য সঙ্গীর সাথে দাম্পত্য জীবনের ভুল বোঝাবুঝিগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে হবে। প্রয়োজনে দুজন মিলে বসে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। পরকীয়া একটি অবৈধ এবং অনৈতিক কাজ। মহান আল্লাহর প্রতি ভয় এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা এই ধরনের পাপ ও ধ্বংসাত্মক পথ থেকে দূরে রাখতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। তারপরেও যদি কেউ পরকীয়ার রাহু গ্রাস থেকে বের হতে না পারে তবে কোনো বিশেষজ্ঞের কাউন্সেলিং বা থেরাপিস্টের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। পরকীয়া তথা ব্যভিচারের মতো ভয়ঙ্কর শাস্তি সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হে মুসলমানেরা! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ করো। কেননা, এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়ায় ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়ায় হয় তা হচ্ছে; পরকীয়ায় যুক্ত ব্যক্তির চেহারার উজ্জ্বলতা বিনষ্ট হয়ে যাবে, তার আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং তার দারিদ্র্য চিরস্থায়ী হবে। বাকি তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে; পরকীয়ায় যুক্ত ব্যক্তির আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে, আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (সহিহ বুখারি)। মনে রাখতে হবে, পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে হলে সুন্দর পারিবারিক ও সামাজিক জীবন এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা খুবই জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...

https://slotbet.online/